রিস্কা জানলায় এসে দাঁড়ায় - ১

১.

কোন কোন জায়গার শিব স্বয়ম্ভু আর কোন জায়গার শিব স্বয়ম্ভু নন, তা নিয়ে বেশ জমিয়ে একটা ডিবেট হয়েছিল বাবার সাথে, অমরকন্টকে বসে। বেশ মিলিজুলি তরিকায় জিনিসটা এসে দাঁড়িয়েছিল এতে, "শিব সবেতেই ফর্মলেস, শেপলেস একটা ব্যাপার" সুতরাং, ডিবেটটাই অবান্তর। 

বাবার সাথে অনেক পথ হেঁটেছিলাম সেদিন। পাথুরে জমি, ওপর নিচ। বাবার কাছে এই হাঁটাগুলোই থেকে যাবে একদিন, এই জেনে বাবা পায়ে ব্যথা নিয়েও হেঁটেছিল। আমি তো হাঁটিই। বাবার সাথে, বাবার বাবার সাথে। কথা হয়, আনতাবড়ি বকি বেশি আমি। আমি হারিয়ে যাওয়ার চেয়েও হারিয়ে ফেলাকে ভয় করতে শিখেছি গত কয়েক বছরে।

২.

সেকেন্ড ইয়ারে স্ট্যাটিক্স পেপারে ফেল করেও বেশ দুঃসাহসিক একটা প্রেম করতে গেছিলাম আমি। বন্ধুদের সাথে, পরিবারের সাথে কোনো কথা নেই, শুধু বেদম দুঃসাহসের পাখায় ভর করে ভোর চারটেয় এক বয়সে বড় মহিলাকে চুমু খাচ্ছিলাম সেন্ট পলসের পাশের ফুটপাথে। বন্ধ চোখের পাতার উপর কুয়াশা আর আশকারা জমছিল। হাতের ফাঁক গলে সময় বেরিয়ে যাচ্ছিল ঝটপট, তখন অত ভাবিনি যদিও। জাস্ট পুলিশের চোখ বাঁচিয়ে, একটা জবজবে চুমু শেষ করে, গাঁজার পাতা, কাগজ, গুটিয়ে নিয়ে, দৌড়। 

শুনেছি মহিলা এখন পারিবারিক সূত্রে পাওয়া রেস্তোরাঁ চালান, এবং সেখানে নাকি কেহ বা কাহারা মার্কসীয় সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেন। নেহাৎ চুনোপুঁটি বলে সে পাড়ায় ঢোকার সাহস করে উঠতে পারলাম না এখনও। আর তারপর তো ব্যাক ক্লিয়ার করতে করতেই একদিন...

৩. 

যখন দেবীর সাথে প্রেম করতাম রাত জেগে, তখনও কিছু মনুষ্যত্ব অবশিষ্ট ছিল আমার। আমার হোস্টেলের ঘরটা ছিল, যাকে বলে, একটা ঠেক। রাতে লাইটস আউটের পর মুড়ি মাখা হত, বৃষ্টি পড়লে, খাটের তলা থেকে বেরোত ওল্ড মঙ্ক(এখন বুঝি আমার মত ছেলেদের কেন কলেজের স্মৃতি বলতে বললে চুপ করে থাকে)। কখনও ক্রিকেট খেলেছি রাত দেড়টায়, দাপিয়ে নিচের তলার ছেলেদের ঘুম চটকেছি। মহারাজ ব্যাট কেড়ে নিয়ে রেখে দেওয়ার পর আরো বেশি করেছি! 

দেবীর মধ্যে বেশ একটা ওম ছিল। ফিরে যাওয়ার খোয়াব, তবে পিছুটান নয় সেটা। একটা সারল্য, আসল না নকল চিনতে শিখিনি তখনও, ছিল। 

বিবেক ভবনের একতলায় কমোডের উপর বসে দুর্গা বিড়িতে সুখটান দিতে দিতে প্রতীক অজান্তেই হিরাক্লিতাস আওড়াতো, "আমরা এক নদীতে নামি, আবার নামি না।" প্রতীক মহানন্দা বাদে আর কোথায় নেমেছে জানি না, তবে সাঁতার জানি না বলে আমার কোনো নদীতেই নামা হয়নি। এখন মনে হয়, ভাগ্যিস!

যাইহোক, একটা ঝড়ো বৃষ্টির দিনে একটা অবিমৃষ্যকারী প্রেমের কফিনে বার্নিশের গন্ধ শুঁকছিলাম আমি। দেবীর জন্যে ঝুমকা নিয়ে গেছিলাম, পরিয়েও দিয়েছিলাম। দেবী বলেছিল, "আমি টাকা দেব, তুই চা টা খা শান্তিতে।"

একটা চ্যাপেলের সামনে দাঁড়িয়ে দমে কবিতা পড়েছিলাম দেবীর জন্য। কারও ষোড়শীবেলার প্রেম, কোন প্রফেসরের যৌন হেনস্থার কেসে ফাঁসা, (মুখরোচক, সন্দেহাতীত)। দেবী কোল ঘেঁষে এলে কি সেদিন একটা চুমু হতে পারতো? হবেও বা। 

৪.

 
বালি-বেলুড় অঞ্চলে সিপিআইএমএল-লিবারেশনের ছাত্র সংগঠন আইসা খুব অ্যাক্টিভ কাজকর্ম করে(বা দেখায়)। ওদের দূর থেকে দেখতে বলেছিলেন স্যার। দূর থেকেই দেখতাম। দূর থেকে দেখতে দেখতেই বিকেলের পাঁচটার ম্যাজিক ধরে দক্ষিণেশ্বর চলে যেতাম। মেট্রো ধরে শোভাবাজার নামতাম। এক বৃদ্ধ আমায় কবিতা লেখা শেখাতেন। তাজা কবিতা দুহাতে জড়িয়ে ধরাটা এককালে কোনো ব্যাপার ছিল না ওনার। বাঁ হাতটা গেছেও ওই করে(খুড়ো লিখেছিলেন বটে, "কবিতার মলোটভ ককটেল.....")

বৃদ্ধ এই বয়সেও, বেশ কায়দা করে এক হাতে সিগারেট ধরাতেন। আমায় বলতেন, প্রতীককে নিয়ে আসতে ওনার কাছে। ইহজগতের যত সূক্ষ্ম মাত্রার ভূমিকম্প, চিড়, এবং তারপর ফাটল ধরা, তাই নিয়ে ছিল ওনার গবেষণা। 
তারপর একদিন, উনি মারা গেলেন।

৫.


এই কবি অর্গানিক হয়েও আমজনতার সাথে প্রেমটা করে উঠতে পারল না। এত ভয়ংকর ইন্টেনসিটির মধ্যবিত্ত, যে চুমু খাওয়ার পর ঠোঁট মোছে(কেউ কেউ সাক্ষীগোপাল বানিয়েছে, হাত পা নেই নাকি, শুধু চোখ)। 

শ্রী ভবনের কলতলায় দাঁড়িয়ে বিকেলে স্নান করতে করতেই একটা আড্ডা হতো এক অনুজের সাথে। বেশ উঠতি বিপ্লবীদের মত মাথা নেড়ে নেড়ে প্রচণ্ড পথের ক্রিটিক থেকে আমাদের কেন ইকোলজি ও মডার্ন সায়েন্স পড়া উচিৎ, তাই নিয়ে, বিশেষ কোন সভায় নিজের কলেজের জনৈক প্রফেসরকে দেখতে পেয়েছি, তার পিনিক নিয়ে, আলোচনা হতো।

••••••

আজও রোমন্থন করছি, ভাবছি। সব কেলেঘাই ত্রিভুজ আঁকতে শেখেনি।



Comments

  1. বৃষ্টিস্নাত নুরেমবার্গ এ এক কাপ চা হোক

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular Posts