স্টক
কলকাতায় লোকজন কমে এসেছে আজকাল।
কলকাতা থাকার শহর কি? কলকাতা ছেড়ে যাওয়ার শহর। কলকাতা ফিরে আসার শহর। ঘাটের পাশে সেই ঘরটায়, যেখানে খুব চুমু খেতে ইচ্ছে হয়েছিল আমার, সেখানে যে একটা কঙ্কাল পড়ে আছে, তার পাঁজর বেয়ে আজ নীলরঙা ফুল বেরিয়েছে। সেন্ট পলস কলেজের ছোট্ট চ্যাপেলটার সামনে যে ছেলেটা ভালবাসতে চেয়েছিল, তার হাতে আজ আশ্চর্য কলম এসেছে। যে মেয়েটা ভালো বাসতে বাসতে উষ্ণতাটুকু হারিয়ে ফেললো, হয়ত, হয়ত, সে এখনো গান গায়?
ওই ফুল, ওই কলম, ওই গান-এসবের জন্যেই কলকাতায় ফিরে আসা।
১: মন জুড়ে মায়াকোভ্স্কি
তলিয়ে ভাবলে দেখা যায়, মানুষকে ভালোবাসতে পারার মতন ক্রেজি সুপারপাওয়ার হয় না। আর ভালবাসা মানে, একেবারে যীশু লেভেলের, বা বুদ্ধ(ভটচাজ না, গৌতম) লেভেলের। এক্কেরে মানইজ্জত খুইয়ে, নাক-কান কাটিয়ে, মাঝরাত্তিরে "কেমন আছ? তোমার কথা খুব মনে পড়ে..."
অথবা হয়ত এগুলো বলতে চাইলেও, লিখতে চাইলেও বলে ওঠা বা লিখে ওঠা হয় না। ফ্ল্যুরিসের কেক যেমন খাব খাব করেও আর খেয়ে ওঠা হয়নি কখনও। ঠিক যেমন বছরের পর বছর ঘুরে গিয়েও, সেই নীল আইলাইনারকে বলে উঠতে পারিনি, "অস্মিতা, একবারটি হাত ধরতে দিবা?" যেমন ময়দানের পাশে ট্রামলাইন, রাজাবাজারের বস্তিতে কাবাবের টুকরো, কিংবা জগন্নাথ ঘাট ওভারল্যাপ হয়ে গেছে। ফ্ল্যুরিসের কেকের ঘাড়ে চেপে গেছে চৈতন্য লাইব্রেরি। নীল আইলাইনার আর সুনীলের নীরা, দুখ দর্দ এবং অনেকটা পীড়া, ঘেঁটে ঘ হয়ে গেছে, তবুও...
তবুও ল্যাদবশত আর লিখে ওঠা হয়নি!
সিনিক হতে গিয়ে ক্রিঞ্জ রকমের ক্ষ্যাপা হয়ে গেছি।
২: কাঁচপোকা সারি সারি, নির্বাণ নির্বাণ ডেকে যায়
"বহুদিন পরে কারো হাত ধরলে, মুখ নয়, হাত কথা কয়"
ঘরের টানে ঘর ছাড়ে যারা, তাদের খোঁজ আদার ব্যাপারীদের কাছে থাকবেই বা কেন। তাও রোদে পিঠ করে মতি নন্দীর গল্প শোনার ন্যাকাচোদা খোয়াব যায় না। শিলং থেকে বেরিয়ে, চেরাপুঞ্জির রাস্তায় যেতে গিয়ে বড় রাস্তা ছেড়ে গিয়ে একটা বসতির দিকে গেলে একটা নাম-না-জানা স্রোত বয়, সেটা দেখতে দেখতে দাঁত ক্যালানোর ইচ্ছে যায় না। এবং সেটার আমি নাম রাখব ডুংরি। ভুল হলো। সেটার আমি নাম রেখেছি ডুংরি। বলতে ইচ্ছে হয়, "একটা পারফেক্ট পৃথিবীতে ডুংরির পাশে তোমায় চুমু খাব", কিন্তু ল্যাওড়া, মুখ দিয়ে কী বেরোয়?
মুখ দিয়ে বেরোয়, "একটা ইনসিগনিয়া খাওয়াও তো!"
•••••••••
দূরের সমুদ্রযাত্রা আমায় ডাকে না।
ডাকে না টেরাকোটা মন্দির আর,
কবিতা লেখা, কাতলার আঁশ গায়ে সরপুঁটি হয়ে থাকা-
নিয়ম মাফিক সব করতে ইচ্ছে করে হঠাৎ করে ,
পেপার পড়া, একটা বিড়ি ধরিয়ে হাগতে যাওয়া, পাঁচ মিনিটে স্নান,
ঘরে ফিরে প্রেমিকাকে ঠিক এক ঘন্টা আদর করা-
ঘরে অ্যাশ করলে আবার ঝাঁট দিয়ে দি।
আমার আশেপাশের মানুষদের নিয়ম ভাঙতে দেখি, মজা লাগে,
মারিয়ার না-প্রেমিক বব ডিলান শুনতে শুনতে
রাতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে,
দূর সমুদ্রতটে বেগনী আকাশের তারা দেখতে দেখতে,
ছুটে হয়ত সে যাবে কেরালা, (বা ক্যালিফোর্নিয়া)
আমাকে সত্যিই আর দূরের সমুদ্রযাত্রা ডাকে না।
আমাকে শুধু ডাকে, "বিড়িটা কানের কাছে বাজিয়ে দেখ, ফাঁপা আওয়াজ!"
৩: ইউ শ্যাল ফাইট, আই শ্যাল উইন
এক হারামি কানের কাছে বহুত হ্যাজ নামায়। ভালবাসা নাকি হেব্বি পলিটিক্যাল কিছু একটা...ব্লাহ ব্লাহ্। কিন্তু ভাই, তোর খারাপ থাকাগুলো নিয়ে একদিন কথা বল!
খারাপ লাগাগুলো আমাদের আবার বেশ রগড়ের জিনিস। মানুষকে অনেক সময় দূরে সরিয়ে আমরা ভাল থাকি। মানে, অনেকে ভাল থাকে। দূরে গিয়ে জেতে, কাছে এসে জেতে, কচি বাচ্চাদের উইন-উইন সিচুয়েশন নিয়ে লেকচার দিয়ে ডুব মারে।
ভাই দেখ।
লাইফে প্রেম করলে বুঝতে পারবি ভগবান কি ক্রেজি একটা ব্যাপার। বুঝতে পারবি তোর জ্বর হলে কেন তোর মায়ের মুখ শুকিয়ে যায়, কেন একটা মেয়ে একা ক্যাম্পাসে কাঁদে, কেন একটা ছেলে ছাদের কার্নিশে উঠে যায়, কেন একটা ছেলে বাড়ি যায় না, কেন তোর একটা ট্যাঙ্ক হওয়া জরুরি।
ভাই, ট্যাঙ্ক হ।
গোলা মার।
আর নিউ ডেমোক্রেসির আর্টিকেলটা পড়ে বল কেমন লাগল।
৪: গুলাব, ইনকিলাব, পাঁজর গুনতে গুনতে বুড়ো, ইত্যাদি
আমার তো আর ফোন আসে না রোজ,
ঢেউয়ের পাঁজর গুনতে শিখিনি,
মেঘদালান বহুদিনই যে নিখোঁজ,
আমি বহুদিন বৃষ্টি দেখিনি-
অরণ্য গুনি, বৃক্ষ চিনি না,
অরণ্যানী আমার জন্যে নয়,
অসলো আর শিলিগুড়ির প্রেম-
বহুদিন এমন গল্প লিখিনি।
আমরাও হব বুড়ো কোনও একদিন,
কলকাতার থেকেও ধূসর হব আমি,
আমার পাঁজর তুই গুনে দিস রোজ,
তোর স্পর্শ তবু, চিনতে শিখিনি!
মানুষ তো ছার, শহর বদলে যায়!
হাতের মুঠোয় হাত বদলে যায়,
ঠোঁটের ফাঁকে ঠোঁট বদলায় জানিস,
আমি তবু তোর শরীর দেখিনি।
স্বর্গ তো নেই, শেষ এক পাতা শুধু-
কোনো চিঠি নয়, স্যারিডন পড়ে আছে
ছ'টাকায় খরিদ, তুমুল স্বর্গসুখ,
ছাড়ব বলেও, ছাড়তে পারিনি!
•••••••••
আমরা সূর্যের চারপাশে পাক খেতে থাকি। একবার পাক হয়ে গেলে পাড়ায় পাড়ায় বাজি ফাটানো হয়, মানুষ আনন্দ করে। আর এই শীতের ইথারের মধ্যে তিনুদের সরকার গরীব মানুষের ঝুপড়ি ভেঙে দেয়।
এই শীতের ইথারে প্রান্তিক গ্রামে মেয়েদের ঋতুর সময় গ্রামের বাইরে ঝুপড়িতে রেখে আসা হয়। সেখান থেকে তাদের ভালুক উঠিয়ে নিয়ে যায়। তাদের উচ্ছেদ করে আদানিকে জমি দেওয়া হয়, গ্রামের পুরুষদের গাছে বেঁধে সিআরপিএফ মেয়েদের গণধর্ষণ করে। এভাবেই পৃথিবী পাক খায়। বোলসেনারো জঙ্গল পুড়িয়ে দেয়, ইসরায়েল জেনোসাইড করে, মণিপুরে গিয়ে ভারতীয় সেনা পশু হয়ে যায়। এভাবেই মানুষ বাঁচে, আর আমি কোন একজনের ঠোঁটে আঙুল বুলিয়ে ভাবি, বোরোলিন মেখেছে, নাকি নিভিয়া?
৫: ভালবেসে তবু পরগাছাকে
কিছু মানুষ যত দূরে যাবে ভেবেছিলাম, তার চেয়েও দূরে চলে যায়।
আর...
নাহ্। আমি শান্তিতে কাঁদব, আর কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়ব এবার। যাক, যে যেখানে পারে। আমার কি।
কলকাতায় আর একটা মানুষ কমে যাক।
Comments
Post a Comment